সেদিন বিকেল থেকেই আকাশটা অদ্ভুত কালো। স্কুল ছুটির পর সবাই দ্রুত বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু রাফি স্কুলের পুরোনো স্টোররুম থেকে বিজ্ঞান মেলার কিছু পোস্টার আনতে গিয়ে আটকে গেল। হঠাৎ শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। স্টোররুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখার সময় রাফির চোখ পড়ল কাঠের একটি পুরোনো বাক্সে। বাক্সটির ঢাকনা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। কৌতূহলবশত খুলতেই সে ভেতরে পেল একটি হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠি। চিঠির ওপর লেখা— “যে এটি পাবে, সে যেন চিঠিটি ঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।” রাফি অবাক হলো। নিচে কোনো নাম নেই, শুধু একটি তারিখ—প্রায় পনেরো বছর আগের। চিঠিতে লেখা ছিল, স্কুলের পেছনের বাগানে একটি আমগাছের নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রাখা আছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে তখন সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। পরদিন সকালে রাফি তার বন্ধু নাবিলকে সব বলল। দুজন মিলে বাগানে গিয়ে পুরোনো আমগাছটি খুঁজে বের করল। গাছটির নিচে মাটি একটু উঁচু হয়ে ছিল। তারা স্কুলের দারোয়ান কাকার অনুমতি নিয়ে জায়গাটি পরীক্ষা করল। কিছুক্ষণ পর মাটির নিচে একটি ছোট টিনের বাক্স পাওয়া গেল। বাক্সে ছিল পুরোনো কয়েকটি ছবি, স্কুলের প্রথম দিকের শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা এবং একটি ছোট নোট। নোটে লেখা ছিল—“এই স্কুলকে যারা গড়ে তুলেছে, তাদের কথা যেন কখনো ভুলে যেও না।” রাফি বুঝতে পারল, এটি কোনো গুপ্তধনের গল্প নয়। আসল সম্পদ হলো স্কুলের ইতিহাস। সে সবকিছু প্রধান শিক্ষকের হাতে তুলে দিল। পরে স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। পুরোনো ছবিগুলো দেখে বর্তমান শিক্ষার্থীরা জানতে পারল তাদের স্কুলের শুরুর দিনের গল্প। রাফি সেদিন বুঝল, কৌতূহল যদি দায়িত্ববোধের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একটি সাধারণ আবিষ্কারও অনেক মানুষকে নিজের অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। 📚 [[পুরোনো লাইব্রেরির বন্ধ ঘর]] 📚 [[হারানো ডায়েরির রহস্য]] 📚 [[ভুল খাতার রহস্য]] 📚 [[সুন্দরবনের পথে হারানো কম্পাস]] 💡 শিক্ষণীয় বিষয়: কোনো অজানা বিষয় দেখলেই শুধু কৌতূহলী হওয়া যথেষ্ট নয়। সত্যতা যাচাই করা, বড়দের জানানো এবং পাওয়া জিনিসের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ছোট ছোট স্মৃতিও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
তানভীরদের গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি পুরোনো বাড়ি ছিল। বহু বছর ধরে সেখানে কেউ থাকত না। বাড়িটির জানালা-দরজা ভাঙা, উঠানে আগাছা আর চারপাশে বড় বড় গাছ। গ্রামের সবাই বাড়িটিকে এড়িয়ে চলত। কারণ রাত হলেই নাকি ওপরতলার একটি জানালায় মৃদু আলো দেখা যেত। তানভীর ভূতের গল্পে খুব একটা বিশ্বাস করত না। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বন্ধুর সঙ্গে বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সত্যিই সে জানালায় আলো দেখতে পেল। বন্ধু রাফি ভয় পেয়ে বলল, “চল, এখান থেকে যাই!” তানভীরও ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তার মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—পরিত্যক্ত বাড়িতে আলো আসে কোথা থেকে? পরদিন স্কুল ছুটির পর সে বিষয়টি বিজ্ঞান শিক্ষককে বলল। শিক্ষক বললেন, “রহস্যের উত্তর খুঁজতে হলে আগে প্রমাণ খুঁজতে হয়। তবে পরিত্যক্ত বাড়িতে একা ঢুকবে না।” তানভীর রাফি ও একজন বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িটির বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু করল। তারা দেখল, বাড়ির পাশের একটি বৈদ্যুতিক তার ভাঙা জানালার কাছে গিয়ে ঢুকেছে। আরও অবাক করার বিষয়—বাড়ির পেছনে একটি পুরোনো বিদ্যুৎ মিটার এখনো লাগানো। 📚 [[স্কুলের ছাদে মধ্যরাতের ছায়া]] তারা সঙ্গে সঙ্গে ভেতরে না ঢুকে স্থানীয় বিদ্যুৎকর্মীকে খবর দিল। কিছুক্ষণ পর তিনি এসে পরীক্ষা করে দেখলেন, পুরোনো তারের একটি অংশ পাশের বাড়ির সংযোগের সঙ্গে ভুলভাবে যুক্ত হয়ে আছে। সন্ধ্যার পর পাশের বাড়ির বাতি জ্বললে সেই বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে পুরোনো বাড়ির ওপরতলার একটি বাতিও ক্ষীণভাবে জ্বলে উঠত। রহস্যের সমাধান হয়ে গেল। তানভীর হাসল। রাফি বলল, “তাহলে এতদিন আমরা ভূতের গল্প শুনছিলাম!” তানভীর বলল, “গল্পটা ছিল ভয়ের। কিন্তু আসল ঘটনাটা ছিল বিদ্যুতের।” 📚 [[পুরোনো লাইব্রেরির বন্ধ ঘর]] পরদিন গ্রামের সবাইকে ঘটনাটি জানানো হলো। পুরোনো বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ নিরাপদভাবে বিচ্ছিন্ন করা হলো। তানভীর বুঝল, অজানা কোনো ঘটনাকে রহস্যময় মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সত্য জানতে হলে ভয়ের কাছে হার মানলে চলবে না। 📚 [[হারানো ডায়েরির রহস্য]] 💡 শিক্ষণীয় বিষয় গুজব বা ভয়ের গল্প শুনে কোনো ঘটনা সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও নিরাপদভাবে প্রমাণ খোঁজার মাধ্যমে সত্য জানা যায়। তবে বিপজ্জনক বা পরিত্যক্ত স্থানে অনুসন্ধান করার সময় অবশ্যই বড়দের সাহায্য নিতে হবে।
স্কুলের পুরোনো ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি ঘর বহু বছর ধরে বন্ধ ছিল। দরজায় মরিচা ধরা তালা এবং উপরে ধুলোমাখা একটি নম্বর লেখা ছিল—২০৭। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সামির প্রতিদিন ওই দরজার পাশ দিয়ে যেত। কিন্তু একদিন সে ভেতর থেকে মৃদু শব্দ শুনল। ঠক... ঠক... ঠক... সামির থেমে গেল। পরদিনও একই সময়ে শব্দটি শোনা গেল। কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে তার বন্ধু নাঈমকে বলল। দুজন মিলে স্কুল ছুটির পর দরজাটির সামনে দাঁড়াল। হঠাৎ আবার শব্দ। ঠক... ঠক... নাঈম ফিসফিস করে বলল, “ভেতরে কেউ আছে নাকি?” তারা দারোয়ান কাদের চাচার কাছে গেল। অনেক অনুরোধের পর তিনি পুরোনো চাবির গোছা নিয়ে এলেন। তৃতীয় চাবিতেই তালা খুলে গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধে সবাই কাশতে শুরু করল। ঘরের এক পাশে ভাঙা বেঞ্চ, পুরোনো মানচিত্র আর কাঠের আলমারি। কিন্তু কোনো মানুষ নেই। তাহলে শব্দটা হচ্ছিল কোথা থেকে? সামির ভালো করে তাকিয়ে দেখল, জানালার পাশে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স নড়ছে। বাক্স খুলতেই তারা অবাক হয়ে গেল। ভেতরে আটকে আছে একটি ছোট শালিক পাখি। জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে ঢুকে সেটি বের হতে পারেনি। ডানা ঝাপটাতে গিয়েই বাক্সের গায়ে বারবার আঘাত করছিল। সামির সাবধানে পাখিটিকে হাতে তুলে জানালার কাছে নিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই শালিকটি আকাশে উড়ে গেল। নাঈম হেসে বলল, “আমরা তো ভেবেছিলাম ভেতরে বড় কোনো রহস্য আছে!” কাদের চাচা বললেন, “রহস্য বড় না ছোট, সেটা দূর থেকে বোঝা যায় না। জানতে হলে দরজা খুলতে হয়।” সামির কিছুক্ষণ বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে রইল। সেদিন সে বুঝেছিল, ভয়ের কারণে অনেক দরজা আমরা বন্ধই রেখে দিই। অথচ সাহস করে খুললে ওপাশে হয়তো ভয় নয়, অপেক্ষা করে থাকে সত্য।
নবম শ্রেণির ছাত্র আদিব পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। স্কুলের সবাই ভাবত, বার্ষিক পরীক্ষায় সে প্রথম হবে। কিন্তু পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে তার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাড়ির ছোট দোকানটি দেখাশোনা করার দায়িত্ব এসে পড়ল আদিবের ওপর। সকালে স্কুল, বিকেলে দোকান আর রাতে বাবার সেবা করতে করতে তার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আদিবের বুক কেঁপে উঠল। সে দুটি বিষয়ে ফেল করেছে। বন্ধুরা যখন নিজেদের ভালো ফল নিয়ে আনন্দ করছিল, আদিব চুপচাপ স্কুলের পেছনের মাঠে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। ঠিক তখন গণিত শিক্ষক সালেহ স্যার তার পাশে এসে বসলেন। “খারাপ লাগছে?” আদিব মাথা নিচু করে বলল, “স্যার, আমি আর পারব না। এত পিছিয়ে গেছি যে আবার শুরু করার কোনো মানে নেই।” স্যার মাটিতে আঙুল দিয়ে একটি বড় শূন্য আঁকলেন। তারপর বললেন, “শূন্যকে সবাই মূল্যহীন মনে করে। কিন্তু সঠিক সংখ্যার পাশে দাঁড়ালে এই শূন্যই তার মূল্য দশ গুণ বাড়িয়ে দেয়।” আদিব অবাক হয়ে তাকাল। স্যার বললেন, “জীবনে শূন্যে নেমে যাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো সেখান থেকেই নতুন হিসাব শুরু হয়।” সেদিন বাড়ি ফিরে আদিব একটি নতুন খাতা বের করল। প্রথম পাতায় লিখল, “আজ থেকে আবার শুরু।” সে বড় কোনো পরিকল্পনা করল না। প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা মন দিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। দোকানে ক্রেতা না থাকলে সূত্র মুখস্থ করত। রাতে বাবার পাশে বসে ইতিহাস পড়ত। যে বিষয়গুলো বুঝত না, পরদিন শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করত। প্রথম মাসে পরিবর্তন খুব কম ছিল। দ্বিতীয় মাসে সে একটি শ্রেণি পরীক্ষায় পাস করল। তৃতীয় মাসে গণিতে পেল ৭২। ধীরে ধীরে তার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে এল। পরের বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আদিব প্রথম হয়নি। সে তৃতীয় হয়েছে। কিন্তু ফলের কাগজ হাতে নিয়ে তার চোখে যে আনন্দ ছিল, প্রথম হওয়ার আনন্দের চেয়েও তা কম ছিল না। সালেহ স্যার দূর থেকে তাকে দেখে হাসলেন। আদিবও হাসল। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, জীবনে কখনো সবকিছু হারিয়ে গেলেও একটি জিনিস থেকে যায়— আবার শুরু করার সুযোগ। আর যে মানুষ শূন্য থেকে আবার শুরু করতে পারে, তাকে হারিয়ে দেওয়া খুব কঠিন।
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি সরু বাঁশের সেতু ছিল। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট একটি খাল। বর্ষাকালে খালের পানি ফুলে উঠলে গ্রামের অনেকেই সেতুটি পার হতে ভয় পেত। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আরমান প্রতিদিন ওই সেতু পার হয়েই স্কুলে যেত। একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে দেখল, সেতুর ওপারে একটি ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। আরমান কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কাঁদছ কেন?” ছেলেটি বলল, “আমার মা অসুস্থ। পাশের গ্রাম থেকে ওষুধ এনেছি। কিন্তু সেতু পার হতে খুব ভয় লাগছে।” আকাশে তখন কালো মেঘ। বাতাসও বাড়ছিল। আরমান জানত, একটু পরেই বৃষ্টি নামতে পারে। সে ছেলেটির হাত ধরে বলল, “ভয় পেও না। ধীরে ধীরে আমার সঙ্গে এসো।” দুজন সাবধানে সেতুতে উঠল। হঠাৎ মাঝপথে একটি বাঁশ কেঁপে উঠল। ছেলেটি ভয়ে চিৎকার করে আরমানের হাত শক্ত করে ধরল। আরমান নিজেও ভয় পেয়েছিল। তবু বলল, “নিচে তাকাবে না। সামনে তাকাও।” ধীরে ধীরে তারা সেতু পার হয়ে গেল। ওপারে পৌঁছাতেই বৃষ্টি শুরু হলো। ছেলেটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “ভাইয়া, তুমি না থাকলে আমি হয়তো যেতে পারতাম না।” আরমান হাসল। তারপর ছেলেটিকে তার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল। বাড়িতে গিয়ে দেখল, ছেলেটির মা সত্যিই জ্বরে কাতর হয়ে শুয়ে আছেন। ওষুধ পেয়ে তিনি আরমানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। “বাবা, আজ তুমি শুধু আমার ছেলেকে সেতু পার করোনি। তুমি আমার দুশ্চিন্তাটাও পার করে দিয়েছ।” বাড়ি ফেরার পথে আরমান আবার সেই বাঁশের সেতুর সামনে দাঁড়াল। সেতুটি আগের মতোই সরু এবং নড়বড়ে। কিন্তু আজ তার কাছে সেতুটিকে অন্য রকম মনে হলো। সে বুঝল, সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। ভয় থাকা সত্ত্বেও কারও পাশে দাঁড়িয়ে সঠিক কাজটি করাই আসল সাহস।
গ্রামের পুরোনো বাড়িটিতে কেউ আর থাকত না। বাড়ির দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে, জানালার কাচ ভাঙা এবং উঠানের ঘাস কোমর পর্যন্ত বড় হয়ে গেছে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তানভীর ছোটবেলা থেকেই বাড়িটা নিয়ে অনেক গল্প শুনেছে। গ্রামের মানুষ বলত, গভীর রাতে বাড়িটির ভেতর থেকে একটি পুরোনো ঘড়ির শব্দ শোনা যায়। টিক... টিক... টিক... কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাড়িটিতে নাকি কোনো ঘড়িই নেই। এক সন্ধ্যায় তানভীর তার বন্ধু শাওনকে নিয়ে রহস্যটা খুঁজতে গেল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল। মেঝেতে শুকনো পাতা আর ভাঙা কাঠ ছড়িয়ে আছে। হঠাৎ শাওন ফিসফিস করে বলল, “শুনতে পাচ্ছিস?” দুজন চুপ হয়ে গেল। টিক... টিক... টিক... শব্দটা আসছে ওপরতলা থেকে। তারা ধীরে ধীরে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল। একটি বন্ধ ঘরের সামনে এসে শব্দটা আরও স্পষ্ট হলো। তানভীর দরজা খুলতেই তারা অবাক হয়ে গেল। ঘরের দেয়ালে ঝুলছে বিশাল একটি পুরোনো ঘড়ি। কিন্তু ঘড়িটির কাঁটা আটকে আছে ঠিক রাত আটটা পনেরো মিনিটে। তবু ভেতর থেকে শব্দ হচ্ছে। তানভীর ঘড়িটির নিচে একটি ছোট কাঠের বাক্স দেখতে পেল। বাক্স খুলে তারা একটি পুরোনো চিঠি পেল। চিঠিটি ছিল বাড়ির সাবেক মালিক আবদুল করিমের লেখা। তিনি লিখেছিলেন, “এই ঘড়িটি আমার ছেলের শেষ উপহার। যত দিন এর শব্দ শুনবে, মনে রেখো, সময়কে অবহেলা কোরো না। চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না।” তানভীর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পরে জানা গেল, ঘড়িটির কাঁটা নষ্ট হলেও ভেতরের পুরোনো যন্ত্রটি এখনও মাঝে মাঝে চলত। সেই কারণেই রাতে টিকটিক শব্দ শোনা যেত। গ্রামের মানুষের কাছে যে শব্দ ছিল ভয়ের, তানভীরের কাছে সেটিই হয়ে গেল একটি শিক্ষা। সেদিন থেকে সে পড়াশোনা, পরিবার আর নিজের কাজের সময়কে গুরুত্ব দিতে শুরু করল। কারণ পুরোনো ঘড়িটি তাকে একটি কথাই শিখিয়েছিল— সময় থেমে থাকে না। তাই সময় থাকতে সঠিক কাজটি করে ফেলাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ।
নবম শ্রেণির ছাত্র রাফি পরীক্ষায় খুব ভালো করতে চেয়েছিল। কিন্তু গণিত ছিল তার সবচেয়ে দুর্বল বিষয়। একদিন পরীক্ষার আগের বিকেলে সে স্কুলের একটি খালি শ্রেণিকক্ষে পড়ছিল। হঠাৎ বেঞ্চের নিচে একটি খাতা দেখতে পেল। খাতাটি খুলতেই তার বুক ধক করে উঠল। সেটি ছিল পরদিনের গণিত পরীক্ষার উত্তর লেখা একটি খাতা। রাফি অবাক হয়ে ভাবল, “এগুলো যদি মুখস্থ করি, তাহলে নিশ্চয়ই ভালো নম্বর পাব!” সে খাতাটি ব্যাগে রাখার জন্য হাত বাড়াল। ঠিক তখনই তার মনে পড়ল গণিত শিক্ষক বলেছিলেন, “নম্বর তোমার সাফল্য দেখাতে পারে, কিন্তু সততা তোমার চরিত্র দেখায়।” রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার সামনে দুটি পথ। একটি সহজ কিন্তু অসৎ। অন্যটি কঠিন কিন্তু সঠিক। শেষ পর্যন্ত সে খাতাটি নিয়ে শিক্ষকের কক্ষে গেল। সবকিছু শুনে শিক্ষক অবাক হলেন। পরে জানা গেল, সেটি আসল প্রশ্নপত্রের উত্তর নয়। শিক্ষক দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অনুশীলনের একটি খাতা তৈরি করেছিলেন এবং ভুল করে শ্রেণিকক্ষে রেখে গিয়েছিলেন। শিক্ষক হাসলেন। “তুমি চাইলে খাতাটা লুকিয়ে রাখতে পারতে। কিন্তু তুমি তা করোনি। আজ তুমি পরীক্ষার আগেই একটি বড় পরীক্ষায় পাস করেছ।” পরদিন রাফি গণিত পরীক্ষা দিল নিজের যোগ্যতায়। সে সর্বোচ্চ নম্বর পায়নি। তবে আগের চেয়ে অনেক ভালো করেছিল। খাতা হাতে নিয়ে সে হাসল। কারণ সেদিন সে বুঝেছিল, পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বরের চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকা অনেক বড় অর্জন।
নদীর ধারে ছোট্ট এক গ্রামে থাকত দশম শ্রেণির ছাত্র রায়হান। সে ছিল বুদ্ধিমান কিন্তু তার একটি খারাপ অভ্যাস ছিল। অন্যের ভালো জিনিস দেখলেই তার মনে হতো, “এটা যদি আমার হতো!” একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে গ্রামের পুরোনো জমিদারবাড়ির পাশে একটি অদ্ভুত বাক্স দেখতে পেল। বাক্সটি মাটির নিচে অর্ধেক চাপা ছিল। রায়হান মাটি সরিয়ে বাক্সটি বের করল। বাক্সের গায়ে সোনালি অক্ষরে লেখা ছিল, “যার মনে লোভ নেই, এই বাক্স তার জন্য আশীর্বাদ। আর যার মনে লোভ আছে, তার জন্য সতর্কবার্তা।” রায়হান হেসে বলল, “একটা বাক্স আবার মানুষের মন বুঝবে কীভাবে?” বাক্সটি খুলতেই তার চোখ বড় হয়ে গেল। ভেতরে চকচকে সোনার কয়েন! রায়হান চারদিকে তাকাল। কেউ নেই। সে একটি কয়েন হাতে নিতেই বাক্সের ভেতর থেকে আরও দুটি কয়েন বেরিয়ে এল। “আরে! এটা তো জাদুর বাক্স!” রায়হান আনন্দে আরও কয়েন নিতে শুরু করল। একটি নিলে দুটি, দুটি নিলে চারটি, চারটি নিলে আটটি। অল্প সময়েই বাক্সটি সোনায় ভরে গেল। রায়হানের মনে লোভ আরও বেড়ে গেল। সে ভাবল, “সব সোনা নিয়ে গেলে আমি গ্রামের সবচেয়ে ধনী মানুষ হয়ে যাব।” কিন্তু যতই সে সোনা তুলছিল, বাক্সটি ততই ভারী হয়ে উঠছিল। হঠাৎ মাটি কেঁপে উঠল। রায়হানের পায়ের নিচের মাটি ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, সোনায় ভরা ভারী বাক্সটি তাকে কাদার মধ্যে টেনে নিচ্ছে। ভয়ে সে চিৎকার করল, “বাঁচাও!” কিন্তু আশেপাশে কেউ ছিল না। তখন তার চোখ পড়ল বাক্সের ভেতরের আরেকটি লেখার ওপর। “যা তোমার প্রয়োজনের বেশি, তা আঁকড়ে ধরলে একদিন সেটাই তোমার বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।” রায়হানের বুক কেঁপে উঠল। সে দ্রুত সোনার কয়েনগুলো আবার বাক্সে ফেলতে শুরু করল। একটি, দুটি, দশটি, বিশটি... শেষ কয়েনটি ফেরত দিতেই মাটি শক্ত হয়ে গেল। বাক্সটিও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বাক্সের ওপর নতুন একটি লেখা ফুটে উঠল, “সবচেয়ে বড় সম্পদ সোনা নয়, সন্তুষ্টি।” রায়হান অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো সোনাই সঙ্গে নিল না। পরদিন স্কুলে শিক্ষক যখন জিজ্ঞেস করলেন, “মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক দুর্বলতা কী?” রায়হান হাত তুলে বলল, “লোভ। কারণ লোভ মানুষকে এমন জিনিসের পেছনে ছোটায়, যা পেতে গিয়ে সে নিজের শান্তি, সততা আর বিবেক হারিয়ে ফেলতে পারে।” শিক্ষক মৃদু হেসে বললেন, “খুব সুন্দর উত্তর।” রায়হানও হাসল। কিন্তু সে কাউকে সোনার বাক্সের কথা বলল না। শুধু যখনই তার মনে অন্যের কিছু পাওয়ার লোভ জাগত, তখনই তার মনে পড়ত সেই রহস্যময় বাক্সের কথাটি— “যা প্রয়োজনের বেশি, তা সম্পদ নয়; অনেক সময় সেটাই বোঝা।”
গ্রামের পশ্চিম পাশে বিশাল একটি বাঁশবাগান। দিনের বেলায় জায়গাটি শান্ত হলেও রাত নামলেই কেউ সেখানে যেতে চাইত না। কারণ কয়েক রাত ধরে বাঁশবাগানের ভেতর একটি অদ্ভুত আলো দেখা যাচ্ছিল। কখনো আলোটি স্থির থাকত। আবার কখনো ধীরে ধীরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেত। এক রাতে নবম শ্রেণির ছাত্র সায়ান জানালার পাশে পড়ছিল। হঠাৎ দূরের বাঁশবাগানের দিকে তাকিয়ে সে আলোটি দেখতে পেল। “আজ রহস্যটা জানতেই হবে,” মনে মনে বলল সে। একটি টর্চ নিয়ে সে তার বন্ধু মাহিনকে ডাকল। দুজন সাহস করে বাঁশবাগানের দিকে এগোল। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাতাসে বাঁশগুলো একে অন্যের সঙ্গে ঘষা খেয়ে কড়কড় শব্দ করছে। হঠাৎ মাহিন সায়ানের হাত চেপে ধরল। “ওই দেখ!” কিছু দূরে আবার সেই আলো। আলোটি এবার নড়ছে। সায়ান টর্চ বন্ধ করে ধীরে ধীরে এগোল। একটু পর তারা মাটিতে কিছু অদ্ভুত চিহ্ন দেখতে পেল। কাদার ওপর ছোট ছোট পায়ের ছাপ। পায়ের ছাপ অনুসরণ করে তারা বাঁশবাগানের গভীরে পৌঁছাল। সেখানে একটি পুরোনো কুঁড়েঘর। ভেতর থেকে ক্ষীণ আলো বের হচ্ছে। সায়ান সাহস করে দরজা ঠেলে দিল। দরজা খুলতেই দুজন অবাক হয়ে গেল। ভেতরে বসে আছে তাদের গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক হাশেম স্যার। সামনে একটি চার্জের বাতি। চারপাশে কয়েকটি আহত পাখি ও দুটি ছোট শিয়ালের বাচ্চা। “স্যার!” হাশেম স্যার মৃদু হেসে বললেন, “ভয় পেয়েছ?” তিনি জানালেন, কয়েক সপ্তাহ আগে বাঁশবাগানে ফাঁদে আটকে থাকা একটি পাখিকে উদ্ধার করেছিলেন। এরপর থেকে রাতে এখানে এসে আহত বন্য প্রাণীদের চিকিৎসা করেন। দিনের বেলায় মানুষ ভিড় করলে প্রাণীগুলো ভয় পাবে বলে তিনি কাউকে কিছু বলেননি। আর যে আলোটি গ্রামের মানুষ দেখত, সেটি ছিল তাঁর চার্জের বাতি। মাহিন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমরা তো ভাবছিলাম এখানে কোনো ভূত আছে!” হাশেম স্যার হেসে বললেন, “অন্ধকারে অজানা জিনিসকে মানুষ খুব সহজেই ভয়ংকর কিছু মনে করে।” পরদিন সায়ান ও মাহিন কাউকে ভয়ের গল্প শোনাল না। বরং কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধুকে নিয়ে হাশেম স্যারকে সাহায্য করতে শুরু করল। তারপর থেকে রাতের বাঁশবাগানে সেই আলো মাঝে মাঝেই জ্বলত। কিন্তু সায়ান আর সেটিকে রহস্যময় আলো মনে করত না। তার কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল মমতা আর ভালোবাসার আলো।
গ্রামের সবাই বাঁশবাগানটাকে একটু ভয় পেত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কেউ সেদিকে যেত না। লোকমুখে শোনা যেত, বাঁশবাগানের শেষ প্রান্তে নাকি বহু বছর ধরে একটি পরিত্যক্ত ঘর আছে। রাত হলে সেখান থেকে মাঝে মাঝে ক্ষীণ আলো দেখা যায়। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আরিফ এসব গল্প বিশ্বাস করত না। কিন্তু তার কৌতূহল ছিল প্রচণ্ড। এক বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তার বন্ধু সজীব বলল, “কাল রাতে আবার ওই ঘরে আলো দেখেছে রহিম চাচা।” আরিফ হেসে বলল, “ভূত হলে বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকবে কেন?” দুজন ঠিক করল, পরদিন বিকেলে রহস্যটা নিজেরাই দেখবে। স্কুল ছুটির পর তারা বাঁশবাগানে ঢুকল। চারদিকে অসংখ্য বাঁশ বাতাসে দুলছে। শুকনো পাতার ওপর হাঁটলে মচমচ শব্দ হচ্ছে। যত ভেতরে যাচ্ছে, গ্রামের মানুষের শব্দ ততই দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সজীব থেমে গেল। “আরিফ, দেখ!” মাটিতে একটি ছোট জুতার ছাপ। তার পাশেই পড়ে আছে নীল রঙের একটি পেনসিল। আরিফ পেনসিলটি তুলে বলল, “এখানে নিশ্চয়ই কেউ আসে।” তারা পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে গেল। বাঁশবাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে সত্যিই একটি পুরোনো টিনের ঘর দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটি সামান্য খোলা। ভেতর থেকে খসখস শব্দ আসছে। সজীব ফিসফিস করে বলল, “ফিরে যাই।” কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল, “কে ওখানে?” দুজন চমকে উঠল। কিছুক্ষণ পর দরজার আড়াল থেকে তাদেরই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রুবেল বেরিয়ে এল। তার হাতে একটি খাতা। আরিফ অবাক হয়ে বলল, “তুমি এখানে কী করছ?” রুবেল প্রথমে কিছু বলতে চাইল না। পরে জানাল, তাদের ছোট ঘরে অনেক মানুষ থাকে। সেখানে পড়াশোনা করার মতো শান্ত জায়গা নেই। এই পরিত্যক্ত ঘরটি খুঁজে পাওয়ার পর সে প্রতিদিন বিকেলে এখানে এসে পড়ে। রাত হয়ে গেলে একটি ছোট চার্জের বাতি জ্বালায়। গ্রামের মানুষ দূর থেকে সেই আলো দেখেই নানা গল্প বানিয়েছে। ঘরের ভেতরে ঢুকে আরিফ আরও অবাক হলো। ভাঙা টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো বই সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে হাতে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। এক পাশে লেখা অঙ্কের সূত্র। সজীব হেসে বলল, “তাহলে গ্রামের ভূতটা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে!” তিনজনই হেসে উঠল। পরদিন আরিফ বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানাল। কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষক ও গ্রামের কয়েকজন মানুষ মিলে পুরোনো ঘরটি পরিষ্কার করলেন। সেখানে টেবিল, বেঞ্চ ও বই রাখা হলো। ধীরে ধীরে জায়গাটির নাম হয়ে গেল “বাঁশবাগান পাঠকক্ষ”। যে বাঁশবাগানের শেষ প্রান্তে যেতে একসময় সবাই ভয় পেত, সন্ধ্যার পর এখন সেখানেই ছোট ছোট বাতি জ্বলে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা বসে বই পড়ে। আরিফ মাঝে মাঝে সেই আলো দেখে মনে মনে হাসে। কারণ সে জানে, অজানাকে ভয় পাওয়ার চেয়ে সত্যটা খুঁজে দেখার সাহস অনেক বেশি শক্তিশালী।