বাঁশবাগানের শেষ প্রান্তে
গ্রামের সবাই বাঁশবাগানটাকে একটু ভয় পেত। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর কেউ সেদিকে যেত না। লোকমুখে শোনা যেত, বাঁশবাগানের শেষ প্রান্তে নাকি বহু বছর ধরে একটি পরিত্যক্ত ঘর আছে। রাত হলে সেখান থেকে মাঝে মাঝে ক্ষীণ আলো দেখা যায়।
অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আরিফ এসব গল্প বিশ্বাস করত না। কিন্তু তার কৌতূহল ছিল প্রচণ্ড।
এক বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তার বন্ধু সজীব বলল,
“কাল রাতে আবার ওই ঘরে আলো দেখেছে রহিম চাচা।”
আরিফ হেসে বলল, “ভূত হলে বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকবে কেন?”
দুজন ঠিক করল, পরদিন বিকেলে রহস্যটা নিজেরাই দেখবে।
স্কুল ছুটির পর তারা বাঁশবাগানে ঢুকল। চারদিকে অসংখ্য বাঁশ বাতাসে দুলছে। শুকনো পাতার ওপর হাঁটলে মচমচ শব্দ হচ্ছে। যত ভেতরে যাচ্ছে, গ্রামের মানুষের শব্দ ততই দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ সজীব থেমে গেল।
“আরিফ, দেখ!”
মাটিতে একটি ছোট জুতার ছাপ।
তার পাশেই পড়ে আছে নীল রঙের একটি পেনসিল।
আরিফ পেনসিলটি তুলে বলল, “এখানে নিশ্চয়ই কেউ আসে।”
তারা পায়ের ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে গেল।
বাঁশবাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে সত্যিই একটি পুরোনো টিনের ঘর দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটি সামান্য খোলা।
ভেতর থেকে খসখস শব্দ আসছে।
সজীব ফিসফিস করে বলল, “ফিরে যাই।”
কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ শোনা গেল,
“কে ওখানে?”
দুজন চমকে উঠল।
কিছুক্ষণ পর দরজার আড়াল থেকে তাদেরই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রুবেল বেরিয়ে এল। তার হাতে একটি খাতা।
আরিফ অবাক হয়ে বলল, “তুমি এখানে কী করছ?”
রুবেল প্রথমে কিছু বলতে চাইল না। পরে জানাল, তাদের ছোট ঘরে অনেক মানুষ থাকে। সেখানে পড়াশোনা করার মতো শান্ত জায়গা নেই। এই পরিত্যক্ত ঘরটি খুঁজে পাওয়ার পর সে প্রতিদিন বিকেলে এখানে এসে পড়ে। রাত হয়ে গেলে একটি ছোট চার্জের বাতি জ্বালায়। গ্রামের মানুষ দূর থেকে সেই আলো দেখেই নানা গল্প বানিয়েছে।
ঘরের ভেতরে ঢুকে আরিফ আরও অবাক হলো। ভাঙা টেবিলের ওপর কয়েকটি পুরোনো বই সুন্দর করে সাজানো। দেয়ালে হাতে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র। এক পাশে লেখা অঙ্কের সূত্র।
সজীব হেসে বলল, “তাহলে গ্রামের ভূতটা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে!”
তিনজনই হেসে উঠল।
পরদিন আরিফ বিষয়টি প্রধান শিক্ষককে জানাল। কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষক ও গ্রামের কয়েকজন মানুষ মিলে পুরোনো ঘরটি পরিষ্কার করলেন। সেখানে টেবিল, বেঞ্চ ও বই রাখা হলো।
ধীরে ধীরে জায়গাটির নাম হয়ে গেল “বাঁশবাগান পাঠকক্ষ”।
যে বাঁশবাগানের শেষ প্রান্তে যেতে একসময় সবাই ভয় পেত, সন্ধ্যার পর এখন সেখানেই ছোট ছোট বাতি জ্বলে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা বসে বই পড়ে।
আরিফ মাঝে মাঝে সেই আলো দেখে মনে মনে হাসে।
কারণ সে জানে, অজানাকে ভয় পাওয়ার চেয়ে সত্যটা খুঁজে দেখার সাহস অনেক বেশি শক্তিশালী।

Comments (0)
Login to comment.