শূন্য থেকে আবার
নবম শ্রেণির ছাত্র আদিব পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। স্কুলের সবাই ভাবত, বার্ষিক পরীক্ষায় সে প্রথম হবে।
কিন্তু পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে তার বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাড়ির ছোট দোকানটি দেখাশোনা করার দায়িত্ব এসে পড়ল আদিবের ওপর। সকালে স্কুল, বিকেলে দোকান আর রাতে বাবার সেবা করতে করতে তার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।
পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আদিবের বুক কেঁপে উঠল।
সে দুটি বিষয়ে ফেল করেছে।
বন্ধুরা যখন নিজেদের ভালো ফল নিয়ে আনন্দ করছিল, আদিব চুপচাপ স্কুলের পেছনের মাঠে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে।
ঠিক তখন গণিত শিক্ষক সালেহ স্যার তার পাশে এসে বসলেন।
“খারাপ লাগছে?”
আদিব মাথা নিচু করে বলল,
“স্যার, আমি আর পারব না। এত পিছিয়ে গেছি যে আবার শুরু করার কোনো মানে নেই।”
স্যার মাটিতে আঙুল দিয়ে একটি বড় শূন্য আঁকলেন।
তারপর বললেন,
“শূন্যকে সবাই মূল্যহীন মনে করে। কিন্তু সঠিক সংখ্যার পাশে দাঁড়ালে এই শূন্যই তার মূল্য দশ গুণ বাড়িয়ে দেয়।”
আদিব অবাক হয়ে তাকাল।
স্যার বললেন,
“জীবনে শূন্যে নেমে যাওয়া মানে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। কখনো কখনো সেখান থেকেই নতুন হিসাব শুরু হয়।”
সেদিন বাড়ি ফিরে আদিব একটি নতুন খাতা বের করল। প্রথম পাতায় লিখল,
“আজ থেকে আবার শুরু।”
সে বড় কোনো পরিকল্পনা করল না। প্রতিদিন মাত্র দুই ঘণ্টা মন দিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিল। দোকানে ক্রেতা না থাকলে সূত্র মুখস্থ করত। রাতে বাবার পাশে বসে ইতিহাস পড়ত। যে বিষয়গুলো বুঝত না, পরদিন শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করত।
প্রথম মাসে পরিবর্তন খুব কম ছিল।
দ্বিতীয় মাসে সে একটি শ্রেণি পরীক্ষায় পাস করল।
তৃতীয় মাসে গণিতে পেল ৭২।
ধীরে ধীরে তার হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে এল।
পরের বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আদিব প্রথম হয়নি।
সে তৃতীয় হয়েছে।
কিন্তু ফলের কাগজ হাতে নিয়ে তার চোখে যে আনন্দ ছিল, প্রথম হওয়ার আনন্দের চেয়েও তা কম ছিল না।
সালেহ স্যার দূর থেকে তাকে দেখে হাসলেন।
আদিবও হাসল।
কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, জীবনে কখনো সবকিছু হারিয়ে গেলেও একটি জিনিস থেকে যায়—
আবার শুরু করার সুযোগ।
আর যে মানুষ শূন্য থেকে আবার শুরু করতে পারে, তাকে হারিয়ে দেওয়া খুব কঠিন।

Comments (0)
Login to comment.