মাটির মাঠের চ্যাম্পিয়ন
নয়ন নবম শ্রেণির ছাত্র। গ্রামের ছোট্ট স্কুলটির মাঠই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। সেখানে ধুলো উড়ত, বর্ষায় কাদা হতো, আর শুকনো মৌসুমে ঘাসও ঠিকমতো গজাত না। কিন্তু সেই মাঠেই প্রতিদিন বিকেলে নয়ন দৌড়ের অনুশীলন করত।
তার স্বপ্ন ছিল বড় একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া।
কিন্তু সমস্যা ছিল—তার ভালো জুতা ছিল না। পুরোনো জুতোর তলা ক্ষয়ে গিয়েছিল। অনেক সময় খালি পায়েই তাকে অনুশীলন করতে হতো।
বন্ধু রাকিব একদিন বলল,
“শহরের ছেলেদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবি কীভাবে? ওদের তো ভালো জুতা, কোচ—সবই আছে।”
নয়ন মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার কাছে সবকিছু নেই। কিন্তু দৌড়ানোর ইচ্ছাটা তো আছে।”
পরদিন থেকেই সে অনুশীলনের নতুন পরিকল্পনা করল। প্রতিদিন একই সময়ে মাঠে আসত। কত সময়ে কত দূর দৌড়াচ্ছে, তা খাতায় লিখে রাখত।
প্রথমে তার গতি খুব একটা বাড়ল না।
বরং একদিন অতিরিক্ত অনুশীলন করে সে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে পরদিন মাঠেই আসতে পারল না।
তার ক্রীড়াশিক্ষক বিষয়টি বুঝতে পেরে বললেন,
“পরিশ্রম মানে নিজেকে শেষ করে ফেলা নয়। বুদ্ধি দিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করাই আসল।”
📚 শেষ দৌড়
নয়ন এবার অনুশীলনের পাশাপাশি বিশ্রাম ও ঘুমের দিকেও নজর দিল। নিজের আগের দৌড়ের সময় লিখে রাখত এবং কোথায় গতি কমে যাচ্ছে তা খুঁজে বের করত।
কয়েক মাস পর স্কুলে বাছাই প্রতিযোগিতা হলো।
নয়ন প্রথম হলো।
তারপর এল উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা।
সেখানে সে দ্বিতীয় হলো।
কিন্তু এবার তার চোখ ছিল আরও বড় লক্ষ্যে—জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা।
সেদিন শহরের বড় একটি স্কুলের কয়েকজন প্রতিযোগীও মাঠে ছিল। তাদের পোশাক ও জুতা দেখে নয়নের মনে এক মুহূর্তের জন্য আত্মবিশ্বাস কমে গেল।
স্টার্টিং লাইনে দাঁড়িয়ে সে নিজের পুরোনো মাঠটার কথা মনে করল।
বাঁশের বেড়া, ধুলোমাখা পথ, খালি পায়ে অনুশীলন—সবকিছু যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
বাঁশি বাজল।
সবাই ছুটে গেল।
নয়ন শুরুতে এগিয়ে গেল না। নিজের গতি ধরে রাখল। শেষদিকে যখন অন্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়তে শুরু করল, তখন সে ধীরে ধীরে সবাইকে পেছনে ফেলতে লাগল।
শেষ কয়েক মিটারে একজন প্রতিযোগী তার পাশে এসে পড়ল।
নয়ন দাঁত চেপে গতি বাড়াল।
ফিনিশিং লাইন পার হওয়ার পর সে হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর ঘোষণা হলো—
“প্রথম স্থান—নয়ন!”
নয়ন কিছু বলতে পারল না।
তার চোখে পানি চলে এল।
📚 বাঁশের সেতুর ওপারে
পুরস্কার হাতে নিয়ে সে নিজের স্কুলের শিক্ষকের কাছে গেল।
শিক্ষক বললেন,
“আজ তুমি শুধু দৌড়ে জিতোনি। তুমি প্রমাণ করেছ, সুযোগ কম থাকলেও চেষ্টা ছোট হতে হয় না।”
নয়ন তার পুরোনো জুতোর দিকে তাকিয়ে হাসল।
যে মাটির মাঠে তাকে অনেকে সাধারণ একজন গ্রামের ছেলে মনে করত, সেই মাঠই তাকে শিখিয়েছিল—চ্যাম্পিয়ন হওয়ার শুরুটা অনেক সময় বড় স্টেডিয়ামে নয়, ছোট্ট একটি মাঠেই হয়।
📚 শিক্ষকের উৎসাহে নিজের লুকিয়ে থাকা প্রতিভা আবিষ্কার করা এক সাধারণ শিক্ষার্থীর গল্প
💡 শিক্ষণীয় বিষয়
সাফল্যের জন্য সুযোগ-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলোই সবকিছু নয়। নিয়মিত অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস, সঠিক পদ্ধতি এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত না বানানোর মানসিকতা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে অসাধারণ সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

Comments (0)
Login to comment.