উইলিস্টন জলাধারে হঠাৎ ভেসে উঠল গাছে ঢাকা ‘দ্বীপ’!

ভাবো তো, বিশাল একটি জলাধারের মাঝখানে নৌকায় করে যাচ্ছো। হঠাৎ দূর থেকে চোখে পড়ল গাছপালায় ঢাকা একটি ছোট্ট দ্বীপ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—সেই দ্বীপটি কোনো মানচিত্রে নেই!
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উইলিস্টন জলাধারে এমনই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেছে। আগস্টের শুরুর দিকে স্থানীয় মানুষ প্রথম গাছপালায় ঢাকা এই অদ্ভুত ভাসমান ভূমিখণ্ডটি দেখতে পান। পরে এর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
দূর থেকে দেখলে জায়গাটিকে একেবারে একটি ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়। সেখানে শুধু শুকনো গাছ বা ভেসে আসা কাঠই ছিল না; বেশ কিছু জীবন্ত গাছও দেখা গেছে। পুরো কাঠামোটির আকারও ছোট ছিল না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৭৫ মিটার পর্যন্ত বলা হয়েছে। অর্থাৎ আয়তনের দিক থেকে এটি প্রায় দুটি আমেরিকান ফুটবল মাঠের কাছাকাছি!
সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল এরপর।
কিছুদিন পর স্থানীয় মানুষ দেখতে পেলেন, আগের জায়গায় সেই ‘দ্বীপ’ আর নেই। যেন হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে! কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। পরে এটি আগের জায়গা থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে আবার দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—একটি গাছে ভরা দ্বীপ কীভাবে জায়গা পরিবর্তন করল?
আসলে এটিকে পুরোপুরি একটি দ্বীপ বলা ঠিক হবে না। এটি সম্ভবত গাছের গুঁড়ি, শিকড়, মাটি ও অন্যান্য উদ্ভিদজাত উপাদান মিলে তৈরি একটি বিশাল ভাসমান কাঠামো। BC Hydro-এর ধারণা, জলাধারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে তীরের কিছু গাছপালা ও কাঠের অংশ আলগা হয়ে ভেসে যেতে পারে। পরে সেগুলোর ওপর থাকা উদ্ভিদসহ একটি বড় ভাসমান ‘ভেলা’র মতো কাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে এর সঠিক গঠন ও কীভাবে এটি এত বড় আকারে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেল, তা নিয়ে এখনও কৌতূহল রয়েছে।
উইলিস্টন জলাধার নিজেও কিন্তু সাধারণ কোনো জলাশয় নয়। এটি ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সবচেয়ে বড় জলাধার এবং W. A. C. Bennett Dam নির্মাণের পর তৈরি হয়। বাঁধ নির্মাণের ফলে ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে বিশাল একটি এলাকা পানির নিচে চলে যায়। বর্তমানে জলাধারটির আয়তন প্রায় ১,৭৬০ বর্গকিলোমিটার।
এই বিশাল জলাধারের মাঝখানে গাছপালায় ঢাকা একটি ভাসমান কাঠামো দেখা যাওয়ায় স্থানীয়দের অবাক হওয়াটা তাই স্বাভাবিক। একজন স্থানীয় নৌযাত্রী এর ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে সেটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিও দেখে অনেকেই প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাসই করতে পারেননি।
আরও একটি বিষয় বেশ interesting—এই ভাসমান কাঠামোর নিচে থাকা শিকড় ও কাঠের ফাঁকে মাছ বা ছোট জলজ প্রাণী আশ্রয় নিতে পারে। ওপরের অংশে পাখি বা অন্যান্য ছোট প্রাণীও সাময়িকভাবে থাকতে পারে। অর্থাৎ দেখতে অদ্ভুত হলেও এটি পানির ওপর একটি ছোট্ট ভাসমান বাস্তুতন্ত্রের মতো আচরণ করতে পারে।
তবে এটিকে কাছে গিয়ে দেখার বা এর ওপর ওঠার চেষ্টা করা নিরাপদ নয়। কারণ এটি শক্ত মাটির দ্বীপ নয়; এর নিচের কাঠ ও উদ্ভিদজাত অংশ অস্থিতিশীল হতে পারে। পানির ঢেউ ও বাতাসের কারণে কাঠামোটির অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে।
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, এটি কোনো রহস্যময় ‘ভূতুড়ে দ্বীপ’ নয়। এর পেছনে প্রাকৃতিক কারণ থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু প্রকৃতি কখনো কখনো এমন দৃশ্য তৈরি করে, যা প্রথম দেখায় কল্পকাহিনির মতো মনে হয়।
উইলিস্টন জলাধারের এই গাছে ঢাকা ভাসমান ‘দ্বীপ’ও ঠিক তেমনই একটি ঘটনা—একদিন দেখা গেল, তারপর হারিয়ে গেল, আবার অনেক দূরে গিয়ে দেখা দিল। প্রকৃতির এমন অদ্ভুত ঘটনাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর জল-জঙ্গল ও পরিবেশের ভেতরে এখনও কত কিছু আমাদের অজানা।

Comments (0)
Login to comment.