মাত্র ১৩ বছর বয়সে আমাজনের জঙ্গলে ৪০ দিন: তিন ছোট ভাইবোনকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখল Lesly?

ভাবো তো, তোমার বয়স মাত্র ১৩ বছর। চারপাশে হাজার হাজার গাছ, অচেনা জঙ্গল, বিষাক্ত সাপ ও বন্য প্রাণীর ভয়। নেই কোনো রাস্তা, নেই দোকান, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক। আর তোমার সঙ্গে আছে আরও তিনজন ছোট ভাইবোন—একজনের বয়স মাত্র ১১ মাস।
এটা কোনো সিনেমার গল্প নয়। ২০২৩ সালে কলম্বিয়ার আমাজন জঙ্গলে সত্যিই এমন ঘটেছিল।
২০২৩ সালের ১ মে, একটি ছোট Cessna 206 বিমান কলম্বিয়ার আমাজন অঞ্চলের Araracuara থেকে San José del Guaviare যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়। বিমানে ছিলেন চার শিশু, তাদের মা Magdalena Mucutuy এবং আরও দুজন প্রাপ্তবয়স্ক। দুর্ঘটনায় তিন প্রাপ্তবয়স্কই মারা যান। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে যায় চার ভাইবোন—১৩ বছরের Lesly, ৯ বছরের Soleiny, ৪ বছরের Tien এবং ১১ মাসের Cristin।
এরপর শুরু হয় তাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
বিমানটি জঙ্গলের গভীরে বিধ্বস্ত হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর শিশুরা কিছু সময় ধ্বংসস্তূপের আশপাশে ছিল। পরে তারা সেখান থেকে সরে জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের মা দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন বেঁচে ছিলেন এবং শিশুদের সাহায্যের জন্য বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন।
চার শিশুর মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল Lesly। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তাকে ছোট তিন ভাইবোনের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হয়।
এখানেই তার Indigenous Huitoto পরিবারের কাছ থেকে শেখা জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমাজনের জঙ্গল তাদের কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল না। ছোটবেলা থেকে জঙ্গলের গাছপালা, ফল ও পরিবেশ সম্পর্কে যে জ্ঞান তারা পরিবারের কাছ থেকে পেয়েছিল, সেটিই বিপদের সময় কাজে লাগে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশুরা জঙ্গলের ফল ও বীজ খেয়ে বেঁচে ছিল।
তবে শুধু খাবার খুঁজে পাওয়া যথেষ্ট ছিল না।
তাদের চারপাশে ছিল ঘন জঙ্গল। বৃষ্টি, পোকামাকড়, বন্য প্রাণী এবং দুর্গম ভূখণ্ড—সবকিছুর মধ্যেই তাদের চলতে হয়েছে। উদ্ধারকারীরা পরে তাদের চলার পথে বিভিন্ন চিহ্ন খুঁজে পান। কোথাও ছিল খাওয়া ফলের অবশিষ্টাংশ, কোথাও শিশুর ব্যবহার করা জিনিস, আবার কোথাও অস্থায়ী আশ্রয়ের চিহ্ন। এসব ছোট ছোট প্রমাণই উদ্ধারকারীদের আশা ধরে রেখেছিল।
এদিকে তাদের খুঁজতে শুরু হয় বিশাল এক উদ্ধার অভিযান।
অভিযানটির নাম দেওয়া হয় “Operation Hope”। কলম্বিয়ার সেনাবাহিনী, Indigenous স্বেচ্ছাসেবক এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী কুকুর এই অভিযানে অংশ নেয়। হেলিকপ্টার দিয়েও বিশাল এলাকার ওপর নজর রাখা হয়। শুধু সেনাবাহিনীর প্রযুক্তি নয়, স্থানীয় Indigenous trackers-দের জঙ্গল সম্পর্কে গভীর জ্ঞানও অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উদ্ধারকারীরা বারবার এমন কিছু চিহ্ন পাচ্ছিলেন, যা প্রমাণ করছিল শিশুরা এখনও বেঁচে থাকতে পারে।
কখনো পাওয়া যাচ্ছিল পায়ের ছাপ, কখনো শিশুর জিনিসপত্র, আবার কখনো জঙ্গলে খাওয়া ফলের অংশ। কিন্তু প্রতিবারই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না।
দিনের পর দিন চলে যায়।
এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, তিন সপ্তাহ...
তারপরও শিশুরা নিখোঁজ।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো আশা ছেড়ে দিত। কিন্তু উদ্ধারকারীরা অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে থাকেন। এমনকি শিশুদের দাদি তাদের Indigenous ভাষায় একটি বার্তা রেকর্ড করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে প্রচার করেন, যাতে শিশুরা নিরাপদ জায়গায় থাকার চেষ্টা করে।
অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন।
৯ জুন ২০২৩। দুর্ঘটনার ৪০ দিন পর উদ্ধারকারীরা চার শিশুকে খুঁজে পান। তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্থান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল। তাদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল—শরীর শুকিয়ে গিয়েছিল, পানিশূন্যতা ছিল এবং পোকামাকড়ের কামড়ের চিহ্নও ছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা সবাই জীবিত ছিল।
উদ্ধারের পর তাদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য Bogotá-তে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই ঘটনা পুরো কলম্বিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। চার শিশুর বেঁচে থাকার পেছনে তাদের Indigenous জ্ঞান এবং বিশেষ করে বড় বোন Lesly-র সাহস ও নেতৃত্বের কথা বারবার উঠে আসে।
আর একটি বিষয় এই ঘটনাটিকে আরও আবেগপূর্ণ করে তোলে।
জঙ্গলে হারিয়ে থাকার সময়ই শিশুদের বয়স বাড়ছিল। এমনকি ছোট Cristin-এর প্রথম জন্মদিনও তারা জঙ্গলের মধ্যেই পার করেছিল।
তবে এই ঘটনাকে শুধু “অলৌকিক ঘটনা” বললে গল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ পড়ে যায়।
এখানে ভাগ্যের পাশাপাশি ছিল জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সাহস এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
Lesly কোনো প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী ছিল না। সে ছিল একজন কিশোরী। কিন্তু নিজের পরিবেশ সম্পর্কে তার যে পারিবারিক ও Indigenous জ্ঞান ছিল, সেটিই কঠিন পরিস্থিতিতে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়েছিল।
এই ঘটনাটি আমাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়।
আমরা কি শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রস্তুত করছি?
নাকি তাদের এমন কিছু বাস্তব জীবনদক্ষতাও শেখাচ্ছি, যা কোনো একদিন সত্যিকারের বিপদের সময় কাজে লাগতে পারে?
পানি কীভাবে নিরাপদে সংগ্রহ করতে হয়, অপরিচিত পরিবেশে কীভাবে সতর্ক থাকতে হয়, জরুরি পরিস্থিতিতে কীভাবে শান্ত থাকতে হয়, সীমিত সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করতে হয়—এসব জ্ঞান হয়তো প্রতিদিন প্রয়োজন হয় না।
কিন্তু প্রয়োজনের সেই একটি মুহূর্তে এগুলোই জীবন রক্ষাকারী হয়ে উঠতে পারে।
কলম্বিয়ার আমাজনের এই চার শিশুর গল্প তাই শুধু একটি বিমান দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়ার গল্প নয়।
এটি একজন ১৩ বছর বয়সী মেয়ের দায়িত্ব নেওয়ার গল্প। এটি পারিবারিক জ্ঞানের মূল্য বোঝার গল্প। আর এটি মনে করিয়ে দেয়—মানুষের বেঁচে থাকার ক্ষমতা শুধু শক্তির ওপর নির্ভর করে না; জ্ঞান, সাহস, বুদ্ধি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।
৪০ দিন পর যখন উদ্ধারকারীরা চার শিশুকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পেয়েছিলেন, তখন তারা শুধু চারটি শিশুকে উদ্ধার করেননি।
তারা এমন একটি গল্পকে পৃথিবীর সামনে এনেছিলেন, যা আজও মানুষকে ভাবায়—একটি শিশু কতটা অসাধারণ দায়িত্ব নিতে পারে, যখন তার সামনে আর কোনো বিকল্প থাকে না। ❤️
আরও পড়ো: হারানো ডায়েরির রহস্য
আরও পড়ো: স্কুলের ছাদে মধ্যরাতের ছায়া
আরও পড়ো: সুন্দরবনের পথে হারানো কম্পাস

Comments (0)
Login to comment.