Mahmudul Hasan
05 Nov 2026, 11:02 AM
General Knowledge

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ৭ নভেম্বরের ইতিহাস

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ৭ নভেম্বরের ইতিহাস

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর ৭ নভেম্বর এই দিনটি স্মরণ করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যান।

তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। তাই এই দিনের ইতিহাস জানতে হলে ঘটনার ধারাবাহিকতা এবং বিভিন্ন পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি জানা প্রয়োজন।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস কবে?

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ৭ নভেম্বর পালিত হয়। এর পেছনে রয়েছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলি।

‘বিপ্লব’ বলতে বড় ধরনের পরিবর্তনকে বোঝায়। আর ‘সংহতি’ অর্থ ঐক্য বা একসঙ্গে থাকা। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

৭ নভেম্বরের আগে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি

৭ নভেম্বরের ঘটনা বুঝতে হলে ১৯৭৫ সালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে রাখতে হবে।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এরপর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়।

এই ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। সেনাবাহিনীর মধ্যেও নেতৃত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে অস্থিরতা দেখা দেয়।

৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থান

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সে সময় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়।

একই রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান—হত্যা করা হয়।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে কী ঘটেছিল?

৩ নভেম্বরের ঘটনার কয়েক দিন পর সেনাবাহিনীর ভেতরে আবার বিদ্রোহ দেখা দেয়। ৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ভোরে সেনাবাহিনীর একাংশ বিদ্রোহ করে। বন্দি অবস্থায় থাকা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও দেখা যায়।

এই ঘটনার সঙ্গে কর্নেল আবু তাহের ও জাসদের একটি অংশের ভূমিকা ছিল।

সামরিক কর্মকর্তাদের মৃত্যু

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। এরপর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসে।

জিয়াউর রহমান কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে এলেন?

একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালেই জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হননি।

৭ নভেম্বরের পর তিনি সেনাবাহিনী ও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। পরবর্তী কয়েক বছরে তাঁর ক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাই ৭ নভেম্বরকে তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বলা যায়।

কেন ৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলা হয়?

৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিএনপি ও এর সমর্থকেরা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাঁদের দৃষ্টিতে এই দিনে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল।

পরবর্তীতে বিএনপি ৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। তবে এই ব্যাখ্যাই ৭ নভেম্বরের একমাত্র ব্যাখ্যা নয়।

৭ নভেম্বর নিয়ে ভিন্ন মত কেন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি বিতর্কিত ঘটনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী দিনটিকে ভিন্নভাবে দেখে।

বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি

বিএনপি ৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে। দলটির মতে, এটি ছিল সৈনিক ও সাধারণ মানুষের ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

জাসদের দৃষ্টিভঙ্গি

জাসদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হয়। কর্নেল আবু তাহের ও তাঁর অনুসারীদের ভূমিকার ওপর এখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।

অর্থাৎ একই দিনের ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে।

৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে কী জানা যায়?

৭ নভেম্বরের ঘটনা শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের যোগসূত্র রয়েছে।

এই ইতিহাস পড়ার সময় আবেগের পাশাপাশি তথ্যের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যার পার্থক্য থাকলেও ঘটনাগুলোর সময়কাল ও ধারাবাহিকতা জানা থাকলে ৭ নভেম্বরকে ভালোভাবে বোঝা যায়।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস কবে পালিত হয়?

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ৭ নভেম্বর পালিত হয়।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ইতিহাস কী?

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহ, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনটি পরবর্তীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত হয়।

৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান কী করেছিলেন?

৭ নভেম্বরের সামরিক বিদ্রোহের সময় জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি ছিলেন। বিদ্রোহী সৈন্যরা তাঁকে মুক্ত করে। এরপর তিনি দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে চলে আসেন।

৭ নভেম্বর কি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন?

না। ৭ নভেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতি হননি। পরবর্তী সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

৭ নভেম্বরকে অন্য কী নামে বলা হয়?

৭ নভেম্বরকে বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন নামে উল্লেখ করে। এর মধ্যে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এবং সিপাহি-জনতার বিপ্লব উল্লেখযোগ্য।

শেষ কথা

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে এবং এরপর দেশের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে।

ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে। তাই ৭ নভেম্বর সম্পর্কে জানতে হলে শুধু একটি পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানা এবং ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বোঝাই সবচেয়ে ভালো উপায়।

◉ 8 views · ♥ 0 · 💬 0 · ↗ 0

Comments (0)

No comments yet.

Login to comment.