Administrator
06 Sep 2026, 11:55 PM
Story

ভূতের গল্প: শেষ ট্রেনের সেই যাত্রী

রাতের ট্রেন আমার কখনোই ভালো লাগে না।

বিশেষ করে শীতের রাতে।

জানালার বাইরে শুধু অন্ধকার, মাঝেমধ্যে দু-একটা আলো পিছনে ছুটে যায়, আর ট্রেনের চাকার একঘেয়ে শব্দ যেন মাথার ভেতর ঢুকে পড়ে।

কিন্তু সেদিন আমার কোনো উপায় ছিল না।

ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। শেষ লোকাল ট্রেনটা ধরতে না পারলে আমাকে স্টেশনেই রাত কাটাতে হতো।

ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।

স্টেশনে মানুষ বলতে গেলে নেই।

দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিল পুরোনো একটা লোকাল ট্রেন। কয়েকটা কামরার আলো জ্বলছিল, কয়েকটার আলো নিভে ছিল।

আমি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে প্রায় দৌড়ে গিয়ে একটা কামরায় উঠে পড়লাম।

কামরায় উঠে প্রথম যে জিনিসটা বুঝলাম, তা হলো—

আমি একা নই।

জানালার পাশে বসে আছে একজন মানুষ।

অদ্ভুত সেই যাত্রী

লোকটার বয়স পঞ্চাশের মতো হবে।

পরনে সাদা পাঞ্জাবি, গায়ে ধূসর চাদর।

মাথা নিচু করে বসে আছে।

আমি বিপরীত দিকের সিটে বসলাম।

কিছুক্ষণ পর ট্রেন ছেড়ে দিল।

ধীরে ধীরে স্টেশনের আলো পিছনে চলে গেল।

আমি মোবাইল বের করে দেখি নেটওয়ার্ক নেই।

লোকটা তখনও মাথা নিচু করে বসে আছে।

আমি ভদ্রতা করে বললাম,

“চাচা, আপনি কোথায় নামবেন?”

লোকটা ধীরে মাথা তুলল।

তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক শান্ত।

সে বলল,

“শালবন।”

আমি একটু চমকে গেলাম।

শালবন স্টেশন আমার গ্রামের আগের স্টেশন।

আমি বললাম,

“ও, আমিও ওই দিকেই যাচ্ছি।”

লোকটা মৃদু হাসল।

তারপর বলল,

“রাতের শেষ ট্রেনে বেশি কথা বলা ভালো না।”

কথাটা শুনে আমার অস্বস্তি হলো।

আমি জানালার বাইরে তাকালাম।

কুয়াশার মধ্যে ট্রেন চলছে।

কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম—

কামরার ভেতর বেশ ঠান্ডা।

এত ঠান্ডা যে নিশ্বাস ফেললে ধোঁয়া বের হচ্ছে।

কিন্তু অন্য কামরা থেকে লোকজনের কথা বলার শব্দ ভেসে আসছে।

অর্থাৎ ট্রেনে মানুষ আছে।

তবু আমাদের কামরাটা যেন আলাদা কোনো দুনিয়ায় আটকে আছে।

যে স্টেশনের নাম কেউ জানে না

প্রায় কুড়ি মিনিট পর ট্রেনের গতি কমে এল।

আমি জানালার বাইরে তাকালাম।

একটা ছোট স্টেশন।

কিন্তু স্টেশনের নামফলকটা অদ্ভুত।

কুয়াশার মধ্যে শুধু কয়েকটা অক্ষর দেখা যাচ্ছে।

“...পুর”

আমি আগে কখনো এই স্টেশন দেখিনি।

ট্রেন থামল।

দরজা খুলল।

কেউ উঠল না।

কেউ নামলও না।

হঠাৎ পাশের লোকটা বলল,

“জানালার বাইরে বেশি তাকাবেন না।”

আমি হাসার চেষ্টা করলাম।

“কেন?”

লোকটা আমার দিকে তাকাল না।

বলল,

“সব যাত্রী ট্রেনে ওঠার জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করে না।”

আমার শরীরটা কেমন শিরশির করে উঠল।

ঠিক তখন জানালার বাইরে একটা ছায়া দেখা গেল।

একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছে।

সাদা শাড়ি।

মাথার চুল মুখের ওপর ঝুলে আছে।

আমি চোখ কচলে আবার তাকালাম।

মহিলাটা এবার জানালার আরও কাছে।

এত কাছে যে তার মুখ কাচের ওপারে।

কিন্তু—

তার মুখে চোখ নেই।

নাক নেই।

মুখ নেই।

শুধু ফ্যাকাশে সাদা চামড়া।

আমি চিৎকার করে উঠে দাঁড়ালাম।

ঠিক তখনই ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

মহিলাটা পিছনে চলে গেল।

আমি হাঁপাতে হাঁপাতে লোকটার দিকে তাকালাম।

সে শান্তভাবে বলল,

“বলেছিলাম তাকাবেন না।”

পুরোনো দুর্ঘটনার কথা

আমি ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

“ওটা কী ছিল?”

লোকটা বলল,

“যে ট্রেন ধরতে পারেনি।”

আমি বললাম,

“মানে?”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“বারো বছর আগে এই লাইনে বড় একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল।”

আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

“একটা রাতের লোকাল ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল। অনেক মানুষ মারা যায়। খবরের কাগজে উঠেছিল।”

আমি বললাম,

“আমি তো কিছু জানি না।”

লোকটা বলল,

“আপনি তখন ছোট ছিলেন।”

কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল,

“দুর্ঘটনার পর এই লাইনে মাঝে মাঝে একটা স্টেশন দেখা যায়, যেটা আসলে নেই।”

“কীভাবে নেই?”

“দিনের বেলায় ওই জায়গায় কোনো স্টেশন পাওয়া যায় না।”

আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

আমি মোবাইলে লোকেশন দেখতে চাইলাম।

স্ক্রিনে শুধু লেখা—

No Service

তারপর হঠাৎ মোবাইলের ঘড়ি থেমে গেল।

সময়—

১২:১৭

সেকেন্ড বদলাচ্ছে না।

আমি লোকটার দিকে তাকালাম।

সে বলল,

“ঘড়ি বন্ধ হয়েছে?”

আমার মুখ শুকিয়ে গেল।

“আপনি কীভাবে জানলেন?”

লোকটা এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাল।

“কারণ প্রতি বছর এই সময়েই ঘড়িগুলো বন্ধ হয়।”

খালি কামরার রহস্য

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

“আমি অন্য কামরায় যাচ্ছি।”

লোকটা বলল,

“যেতে পারেন।”

আমি কামরার দরজা খুললাম।

পরের কামরায় ঢুকেই থমকে গেলাম।

পুরো কামরা খালি।

একজন মানুষও নেই।

অথচ কয়েক মিনিট আগেও এখান থেকে মানুষের কথা বলার শব্দ শুনেছি।

আমি আরও সামনে গেলাম।

দ্বিতীয় কামরা।

খালি।

তৃতীয় কামরা।

খালি।

সিটের ওপর ধুলা।

কিছু জায়গায় মাকড়সার জাল।

এমন মনে হচ্ছে বহুদিন এই কামরায় কেউ বসেনি।

আমার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো।

আমি পিছনে ফিরে আগের কামরার দিকে যেতে চাইলাম।

তখনই পেছন থেকে ফিসফিস শব্দ এল।

“ভাই...”

আমি থেমে গেলাম।

আবার—

“ভাই... দরজাটা খুলে দেন...”

শব্দটা আসছে ট্রেনের বাইরের দিক থেকে।

কিন্তু ট্রেন তখন প্রচণ্ড গতিতে ছুটছে।

আমি ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকালাম।

একজন ছেলে জানালার বাইরে ঝুলে আছে।

তার বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।

সে কাচে হাত ঠুকছে।

“দরজা খুলে দেন...”

তার মাথার এক পাশ রক্তে ভেজা।

আমি পিছিয়ে গেলাম।

ঠিক তখন আমার কাঁধে কেউ হাত রাখল।

আমি চিৎকার করে ঘুরলাম।

সেই সাদা পাঞ্জাবি পরা লোকটা।

সে বলল,

“ওদের কথা শুনবেন না।”

আমি কাঁপা গলায় বললাম,

“ওরা কারা?”

লোকটা বলল,

“যারা সেদিন ট্রেন থেকে নামতে পারেনি।”

তালাবদ্ধ শেষ কামরা

লোকটা আমাকে নিয়ে আবার আগের কামরায় ফিরল।

এবার আমি খেয়াল করলাম, তার পায়ের শব্দ হয় না।

আমি চুপ করে তার পায়ের দিকে তাকালাম।

সে হেঁটে যাচ্ছে।

কিন্তু মেঝেতে তার ছায়া নেই।

আমার বুকের রক্ত যেন জমে গেল।

আমি কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম।

লোকটা বুঝতে পারল।

সে বলল,

“ভয় পেয়েছেন?”

আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।

সে হালকা হাসল।

“ভয় পাওয়া ভালো। ভয় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”

এরপর সে কামরার শেষ মাথায় একটা দরজার সামনে দাঁড়াল।

দরজাটা তালাবদ্ধ।

সে বলল,

“এই দরজাটা কিছুতেই খুলবেন না।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কেন?”

সে বলল,

“ওপাশে যারা আছে, তারা জানে না যে তারা মারা গেছে।”

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দরজার ওপাশ থেকে ধাক্কা শুরু হলো।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

তারপর অনেকগুলো কণ্ঠ একসঙ্গে বলতে লাগল—

“দরজা খোলো...”

“আমরা নামব...”

“স্টেশন চলে এসেছে...”

আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।

হঠাৎ দরজার নিচ দিয়ে রক্তের মতো কালচে তরল বের হতে শুরু করল।

আমি চিৎকার করে পিছিয়ে গেলাম।

লোকটা আমাকে ধরে বলল,

“চোখ বন্ধ করুন।”

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

তারপর শুনলাম—

প্রচণ্ড একটা ব্রেকের শব্দ।

ধাতব কিছু ভাঙার শব্দ।

মানুষের চিৎকার।

কাচ ভাঙার শব্দ।

মনে হলো পুরো ট্রেনটা উল্টে যাচ্ছে।

আমি সিট আঁকড়ে ধরলাম।

তারপর—

সব চুপ।

শালবন স্টেশন

কেউ যেন আমার কাঁধ ঝাঁকাচ্ছে।

“ভাই, উঠেন।”

আমি চোখ খুললাম।

একজন রেলকর্মী দাঁড়িয়ে আছে।

সকাল হয়ে গেছে।

আমি একটা স্টেশনের বেঞ্চে শুয়ে আছি।

চারপাশে মানুষ।

আমি উঠে বসে বললাম,

“ট্রেন?”

লোকটা বলল,

“কোন ট্রেন?”

“রাতের শেষ লোকাল!”

রেলকর্মী অবাক হয়ে বলল,

“আপনাকে ভোরে প্ল্যাটফর্মের পাশে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে।”

“অসম্ভব! আমি ট্রেনে ছিলাম।”

লোকটা আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল।

“কাল রাতের শেষ লোকাল তো বাতিল হয়েছিল।”

আমার মাথা ঘুরে উঠল।

“না... আমি নিজে উঠেছি।”

রেলকর্মী বলল,

“আপনি কোন স্টেশন থেকে উঠেছিলেন?”

আমি নাম বললাম।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

“বারো বছর আগে ওই স্টেশন থেকে একটা শেষ লোকাল ছেড়েছিল। শালবনের আগেই দুর্ঘটনা হয়েছিল।”

আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

আমি বললাম,

“সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন লোক ছিলেন। বয়স পঞ্চাশের মতো।”

রেলকর্মীর মুখের রং বদলে গেল।

“কেমন দেখতে?”

আমি যতটা পারি বর্ণনা দিলাম।

লোকটা আমাকে স্টেশন মাস্টারের ঘরে নিয়ে গেল।

দেয়ালে কয়েকটা পুরোনো ছবি ঝুলছে।

একটা ছবির সামনে গিয়ে আমার পা থেমে গেল।

সেই লোক।

সাদা পাঞ্জাবি।

শান্ত চোখ।

ছবির নিচে লেখা—

মো. জাহিদুল ইসলাম
সহকারী স্টেশন মাস্টার
মৃত্যু: ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

আমার হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল।

রেলকর্মী বলল,

“দুর্ঘটনার রাতে উনি নিজের জীবন দিয়ে কয়েকজন যাত্রীকে বাঁচিয়েছিলেন।”

আমি ছবির দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার কানে আবার তার কণ্ঠ ভেসে এল—

“ভয় পাওয়া ভালো। ভয় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।”

গল্পের শেষ রহস্য

আমি সেদিন বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম।

বিকেলে ব্যাগ খুলতে গিয়ে দেখি ভেতরে একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।

টিকিটটা হলুদ হয়ে গেছে।

তারিখ লেখা—

১৭ ডিসেম্বর ২০১৪

সিট নম্বর—

৩১

আমি জানতাম, ওই টিকিট আমার নয়।

আরও অদ্ভুত ব্যাপার হলো—

টিকিটের পেছনে পেন্সিলে একটা বাক্য লেখা।

“আগামী বছর শেষ ট্রেনে উঠবেন না।”

আমি অনেকক্ষণ টিকিটটা হাতে নিয়ে বসে ছিলাম।

পরের বছর ডিসেম্বর এলো।

১৭ ডিসেম্বর রাতে আমি কোথাও বের হইনি।

কিন্তু রাত ঠিক ১২টা ১৭ মিনিটে দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা ট্রেনের হুইসেল শুনতে পেলাম।

আমাদের এলাকার মানুষ বলল—

সেই রাতে ওই লাইনে কোনো ট্রেন চলেনি।

তারপরও আমি জানালার পর্দা সরাইনি।

কারণ আমি এখন জানি—

কিছু ট্রেন যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যায়।

আর কিছু ট্রেন—

হারিয়ে যাওয়া যাত্রীদের আবার খুঁজতে ফিরে আসে।

◉ 3 views · ♥ 0 · 💬 0 · ↗ 0

Comments (0)

No comments yet.

Login to comment.